অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, উন্নয়ন প্রকল্পের ধুলোবালি, যানবাহন ও ইটভাটার ধোঁয়ায় ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর এখন স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ ধুলোর নগরীতে পরিণত হয়েছে। মূলত চার কারণে ধুলোর শহরে বন্ধি হয়ে পড়েছে রাজধানীতে বসবাসরত প্রায় কোটি মানুষ। তারমধ্যে রয়েছে-উন্নয়ন প্রকল্পের বিশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, পরিবেশগত বিপর্যয় ও যানবাহনের ধোঁয়া।
বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এই দূষণ চরম আকার ধারণ করে। যার ফলে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি ও শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। শহরের গাছপালাও ধুলার আস্তরণে ঢাকা পড়ছে। তার উপর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্ত রাখা এবং সময়মতো পানি ছিটানো না হওয়ায় ধুলো দূষণ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, ঘন ধুলোর আস্তরণ বাতাসে থাকায় নগরবাসী শ্বাসযন্ত্রের ইনফেকশন, চোখ ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকা শহরের গাছপালায় প্রচুর পরিমাণে ধুলা জমে, যা গাছকে রোগাক্রান্ত করছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। পুরাতন যানবাহনের কালো ধোঁয়া ধুলোর সাথে মিশে বায়ুমান সূচক (অছও) অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সঠিক নিয়মে নির্মাণ কাজ পরিচালনা, নিয়মিত পানি ছিটানো এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
জানা গেছে, শীত মৌসুমের সকালে যে পাতায় শিশির থাকার কথা সেখানে জমেছে ধুলো। বেলা গড়ালে ধুলো ঝরে। ভারী হয়ে ওঠে নগরীর বাতাস। এর মূল কারণ হচ্ছে-ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিভিন্ন সংস্থার (ওয়াসা, ডেসকো, ডিপিডিসি, তিতাস) সমন্বয়হীনতা। যার কারণে বছরজুড়েই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলে এবং জনভোগান্তি বাড়ে। এছাড়াও পয়ঃনিষ্কাশন পাইপ, বিদ্যুতের তার, ও গ্যাস লাইন স্থাপন/মেরামতের নামে অলিগলিতে গাঁইতি-শাবলের কোপে এই দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। তবে পথচারীরা জানান, যে রাস্তায় বের হন প্রতিটি রাস্তায় ধুলো। তারা এর সমাধান চান। রাস্তাঘাট ভাঙা, বৃষ্টি নেই শীতকাল তাই আরও ধুলোবালি বেশি শহরজুড়ে।
শীত এলেই মহানগরীর এমন চিত্র নিত্যদিনের। ধুলোর সঙ্গেই যেন সহাবস্থান নগরবাসীর। আর তাতে ভাসছে ক্ষতিকর সব কণা, যা রীতিমতো নগরবাসীকে ভোগাচ্ছে। ধুলোর এ আস্তরণ রাজধানীকে ক্রমেই নিয়ে যাচ্ছে দূষণের শীর্ষ নগরীতে। তবে রাজধানীজুড়ে চলা একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প-রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেন সংস্কারের ফলে পরিবেশ বেশি দূষিত হয়। এতে যেমন শহরের সৌন্দর্য হারাচ্ছে, তেমনি মানুষের স্বাভাবিক জীবনও ঢেকে যাচ্ছে ধুলোর স্তরে।
রাজধানীতে লাগাতার খোঁড়াখুঁড়ি, আর বাতাসে উড়তে থাকা ধুলোর দম বন্ধ করা মিশ্রণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শহরজীবন। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সড়কগুলো এখন যেন রণক্ষেত্র-যানজট, ধুলোবালি আর গরমে নাকাল পথচারী ও চালকরা। তেজগাঁও শিল্প এলাকার বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেন মেরামত ও পাইপলাইন স্থাপন কাজ চলমান থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী, চালক ও ব্যবসায়ীরা। নির্ধারিত সময়েও অনেক সড়কের কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। এই এলাকার একাধিক স্থানে বিগত কয়েক মাস ধরে চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ এখন স্থানীয়দের জন্য দুর্ভোগের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কসকো কোম্পানির দারোয়ান অর্জুন বলেন, কলোনী বাজার থেকে নাবিস্কো পর্যন্ত সড়কে প্রায় এক বছর ধরে কাজ চলছে। প্রতিদিনই বিঘ্ন ঘটে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে। খোঁড়াখুঁড়িতে এই সড়কে যাতায়াতকারী জনসাধারণ ও মালবাহী গাড়ির ভোগান্তি নিত্যদিনের। তেজগাঁও শিল্প এলাকার মুদি দোকানদার বিপ্লব জানান, চ্যানেল আইয়ের সামনের গলি থেকে লাভ রোড পর্যন্ত সড়কে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সংস্কার এবং পানির লাইনের পাইপ বসানোর কাজ চলছে ১৫ দিন ধরে। সড়কটি খুঁড়ে রাখায় ব্যবসা-বাণিজ্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তিনি বলেন, সড়কটি খুঁড়ে রাখায় প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে মানুষকে। আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটির সামনে থেকে আরটিভি ও আমাদের সময় অফিসের সামনের সড়কটির বড় একটি অংশ প্রায় ২০-২৫ দিন ধরে মাঝ বরাবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে। শুধু রিকশা কোনোরকমে চলাচল করতে পারলেও ট্রাক বা লরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে। এতে শিল্পাঞ্চলের পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়ন কাজ দরকার থাকলেও দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়ের অভাবে ভোগান্তি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। তারা দ্রুত সড়কগুলো ব্যবহারের উপযোগী করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা হওয়ায় এসব সড়কের দ্রুত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি- এমনটাই মত সাধারণ মানুষের। শহরের প্রাণকেন্দ্রের এমন অচলাবস্থা দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকি প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। একজন অফিসগামী পথচারী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, প্রতিদিন এই রাস্তা পার হতে ১০ মিনিটের জায়গায় আধা ঘণ্টা লাগে। শীতের দিনেও ধুলোয় চোখ মুখ ভরে যায়। মনে হয় শহরটা যেন ধুলোর নগরীতে পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধুলোবালির মূল ক্ষতি হচ্ছে শ্বাসযন্ত্রে। দীর্ঘ সময় ধুলায় থাকলে অ্যাজমা, অ্যালার্জি, কাশি, গলার ব্যথা ও ত্বকের সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। অনেকেই মাস্ক পরে বাইরে বের হলেও তাতে পুরোপুরি সুরক্ষা মিলছে না। দয়াগঞ্জের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, জানালাও খুলতে পারি না, ঘরে ধুলো ঢুকে যায়।
আইকিউএয়ারের তথ্য বলছে,ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারি মাসে রাজধানীর বাতাস অস্বাস্থ্যকর থেকে অতি অস্বাস্থ্যকর। যার প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্যে। তবে অনকোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, এসময় অ্যাজমার রোগী, শ্বাসকষ্টের রোগী বেড়ে যায়। এ মুহুর্তে হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডা, অ্যাজমা, অ্যালার্জির রোগী বেশি পাবেন। বাচ্চাদের মধ্যে এর প্রভাব সব থেকে বেশি পড়ে। অভিযোগের তীর নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের দিকেও। কাজে মানা হচ্ছে না পরিবেশবিধি। এ বেহাল অবস্থার দায় সিটি করপোরেশনসহ নীতি নির্ধারকদের ওপর চাপাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির এর সঙ্গে। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে সব থেকে বেশি নির্মাণ কাজের জন্য ধুলো হয়। এগুলো ঢাকা শহরের বায়ুকে দূষিত করে। আমাদের এ বিষয়ে নীতিমালা আছে অর্থাৎ আমি যখন কাজ করবো কীভাবে কাজটি করবো, ধুলো কীভাবে কমাবো সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা আছে। তবে আমরা দেখি ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় এর কোনো কিছুই মানা হয় না। সংস্কার ও নির্মাণ নীতির বাস্তবায়ন, আর নগর পরিকল্পনাকারীদের সমন্বিত ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ রাজধানীর বাতাসকে নির্মল করে তুলবে এমন প্রত্যাশা এ পরিবেশবিদের।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
* ধুলায় নাকাল ঢাকা, চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নগরবাসী
ধুলোর শহরে বন্দি নগরজীবন
- আপলোড সময় : ১১-০১-২০২৬ ১০:১৪:৪৯ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১১-০১-২০২৬ ১০:১৪:৪৯ অপরাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সফিকুল ইসলাম